সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা সুন্দর প্রেমের সাক্ষী হয়েছিলাম। ছেলেটা (নাম সিজান) আমার রুমমেট ছিলো আমারা একই বিভাগেই পড়তাম কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং।মেয়েটা পড়ত সিলেট নার্সিং কলেজে।
প্রতিমাসে যখন আমাদের খরচের জন্য বাসা থেকে টাকা দেওয়া হতো তখন দেখতাম সিজান সেখান থেকে কিছু টাকা আলাদা করে রেখে দিতো। কথায় কথায় একদিন সিজান কে জিজ্ঞেস করে ফেললাম কিরে প্রতি মাসে খরচের টাকা থেকে কিছু টাকা তোর আলাদা করে রাখার কারন কি,তখন সে হেঁসে বললো বুঝলি আনিকা ভীষণ অভিমানী।একদিন যদি ভুল করে তার জন্য গোলাপ না নিয়ে যাই তাহলে সে অভিমান করে আর আমার সাথে সারাদিন কথাই বলে না। এভাবেই চলতে লাগলো তাদের প্রেম।রাত ভোর কথা বলা, দুপুরের খাবারের টাকা বাঁচিয়ে প্রিয়সির জন্য রক্ত গোলাপ নিয়ে যাওয়া।পকেটে টাকা না থাকার কারনে হেঁটে হেঁটে কিং-ব্রিজ বা ধোপাদিঘী কি ওয়াক ওয়ে ঘুরতে যাওয়াই ছিলো তাদের রুটিনের মধ্যে।
তারপর হটাৎ একদিন বিকেলে সিজানের বাসা থেকে কল আসে,আঙ্কেল নাকি স্ট্রোক করেছেন। তাকে সিলেট উসমানী মেডিকেলে নিয়ে আসা হচ্ছে, ঐদিন বিকেলেই সিজান চলে গেলো মেডিকেলে। পরদিন আমি, সাথে আমাদের দু'জন রুমমেট ও আনিকাও গেলাম।গিয়ে দেখি আঙ্কেলকে নিউরো সার্জন এ ভর্তি করানো হয়েছে,আঙ্কেলের শরীরের বাম সাইড প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। এর দুদিন পর আঙ্কেলকে মেডিকেল থেকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো,সাথে সিজান ও বাসায় চলে গেল। একদিন যায় দুদিন যায় সিজান আর আসে না, এর ঠিক 23 দিন পর সে আসলো। আমাদের পরিচিত সবার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সে চলে যাওয়ার জন্য সে তৈরি হচ্ছিল, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম আবার কবে আসবি, সিজান বললো আর আসবো বলে মনে হয় না এখানেই পড়াশোনার সমাপ্তি। বাবাই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, এখন ছোট বোনটাকেও বিয়ে দিতে হবে, ছোট ভাইটা কেও পড়াশোনা করাতে হবে যেটা আমার আম্মার পক্ষে করা সম্ভব না। আমি বললাম তাহলে এখন তুই কি করবি, সে বলল যে মামার সাথে সৌদি চলে যাবো সেখানে গিয়ে যদি পরিবারের জন্য কিছু করতে পারি। তারপর আমি আর তাকে কিছু বললাম না, সে চলে যাওয়ার বন্দর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসলাম। সে যাওয়ার সময় সে বলে গেল আনিকাকে একটু দেখিস। আমি বললাম আচ্ছা, সে চলে গেল, তা ঠিক একমাস ১২ দিন পর তার সৌদির ফ্লাইট, আগের দিন নাকি তার ঢাকা যেতে হবে সেখান থেকে সে সৌদিতে যাবে। সে ঢাকা যাওয়ার আগের দিন আমি ও আমাদের দুই রুমমেট গেলাম সিজানের সাথে শেষবারের মতো দেখা করার জন্য। গিয়ে দেখি আনিকাও সেখানে, তখন কবি রুদ্রের একটা কথা মনে পড়ল, মৃত্যুর মত প্রেমের অনিবার্য সত্য ডাকলে তোমাকে যেতে হবেই,এজন্যই মনে হয় আনিকা সেদিন ১১০ কিলোমিটার পারি দিয়ে শেষ দেখা করতে গিয়েছিলো সিজানের সাথে।সেদিন সিজান কে প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম সাথে আনিকাও কাঁদল প্রচুর কাঁদল।আমি মানুষকে সান্তনা দিতে পারিনা,কিভাবে সান্তনা দেয় সেটাও জানি না,তাই সেদিন তাদের দু'জনের কাউকেই আমি সান্তনা দিতে পারিনি। সিজানকে বিদায় দিয়ে আমরা চলে আসলাম আবার যার যার স্থানে।জীবন আমাদের সে আগের নিয়মেই চলছে,সিজানের জায়গাটা এখন অন্য কেউ এসে দখন করছে। তারপর সিজান সৌদিতে যাওয়ার আনুমানিক ৪ মাস পরে দেখি আনিকা ও একটা সুদর্শন ছেলে আমাদের ক্যাম্পাসের সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমাকে দেখে আনিকা নিজের অপরাধী চোখগুলো লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলো।আমিও ভাবলাম হয়তো কোন আত্মীয়র সাথে ঘুরতে আসছে।তারপর তাদের দুজনে প্রায় এখানে সেখানে দেখা যেতো।একদিন সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে সার্টিক হাউজের দিকে ঘুরতে গিয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে দেখি আনিকা আর সেই সুদর্শন ছেলেটা নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে গল্প করছে।তখন বিষয়টা আমার কাছে অন্য রকাম লাগার কারনে রাতে সিজানকে জিজ্ঞেস করলাম যে আনিকার কি খবর তাকে তো প্রায় এখানে সেখানে দেখা যায় একটা ছেলের সাথে।তখন সিজান বললো ছেলেটা খুব সুন্দর না রে,তাদের দুজনকে মানিয়েছো বেশ।আমি চলে আসার দুমাস পরে আনিকা ছেলেটার সাথে সম্পর্ক করে।ছেলেটা মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ, আনিকা তাকে খুব ভালোবাসে বুঝলি তাকে খুব ভালো রাখবে রে।সেদিনও আমি সিজানকে সান্তনা দিতে পারিনি।
তার কিছুদিন পরে আনিকা সে ছেলেটাকে বিয়ে করে নেয়।সিজান হয়তো জানেও না যে আনিকার বিয়ে হয়ে গেছে। সে হয়তো রোজ নিয়ম করে অপেক্ষা করে যেন কোন মিরাকল ঘটুক আনিকা আবার তার কাছে ফিরে আসুক।সে হয়তো জানেও না এটা আর সম্ভব না, কোন ভাবেই না।অপেক্ষা করতে করতে একদিন সিজানের এই অপেক্ষা উপেক্ষায় পরিনত হবে।
গল্প- অপেক্ষা
~মাহীদুল হাসান সাইফ
Comments
Post a Comment