#মেঘের_দেশে_পাড়ি
ঘরটা অনেক বেশি ঠান্ডা। চারদিকে নানা যন্ত্রপাতি। অনেকগুলো প্যাঁচানো নল বেডের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। দুইটা বড় বড় মনিটর। সেদিকে তাকিয়ে ফিলিপিনো এটেন্ডেন্ট মেয়েটা ট্যাবলেটে কি যেনো ডেটা ইনপুট দেয়। বেশিরভাগ সময় আমি বেডটাতে শুয়ে থাকি। শুয়ে থাকতে থাকতে আমার খুব অস্থির লাগে, বিছানা থেকে নেমে যাবার জন্য ছটফট করি। কিন্তু লাভ হয় না,- কি যেনো একটা অদৃশ্য শক্তি আমাকে বিছানার সাথে আটকে রাখে। প্রায়ই আমি ফিলিপিনো মেয়েটাকে বলি, আতে, আমি বাইরে যেতে চাই। আমাকে একটু বিছানা থেকে নামিয়ে দিবে।
মেয়েটা আমার কথা শুনতে পায় না, সে আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তার দৃষ্টি থাকে মনিটরের স্ক্রীনে। যেনো এই পৃথিবীর তাবত ডেটা তাকে একাই ইনপুট দিতে হবে ট্যাবলেটে।
তবে মাঝে মাঝে আমি বিছানা ছেড়ে নিচে নামতে পারি। এই ঘটনা ঘটে হঠাৎ হঠাৎ। ঘর হতে বের হয়ে আমি অবশ্য বেশি দূর যেতে পারি না। বড় জোর লম্বা বারান্দা পর্যন্ত। প্রতিদিন একই দৃশ্য দেখি। কাজল দরজার বাইরের চেয়ারটায় বসে চোখ মুছে। জহির ভাই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। আমি জানি জহির ভাই বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখে। উনার একটাই কাজ আকাশ দেখা। প্রায় রাতেই রুমে টোকা মেরে বলবে, মমিন ভাই, ঘুমিয়ে পড়েছেন। বাইরে আসুন, রাস্তায় হাঁটি।
জহির ভাইয়ের কাছ থেকেই আমি আকাশ দেখা শিখেছি, ঘন্টার পর ঘন্টা উদ্দেশ্যহীন ভাবে রাস্তায় হেঁটেছি। চাঁদ উঠলেই তিনি রাস্তায় নেমে পড়েন। লোকটা অদ্ভুত কিসিমের। দুনিয়ার কোনো কিছুতেই উনার আগ্রহ নাই, তবে চিংড়ি মাছ আর করল্লা ভাজি হলে তিনি খুব তৃপ্তি নিয়ে ভাত খান। আমার খুব ভালো লাগে উনার ভাত খাওয়া দেখতে। এক এক লোকমা ভাত মুখে দেন, কি রকম অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
আজও কাজল কাঁদছে। জহির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, মমিন ভাই কি ফিরবো না? জহির ভাই সে কথার উত্তর দিলেন না, আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কাজল হু হু করে কাঁদছে। আমি কাজলের দিকে তাকিয়ে বললাম, এই কাজল, কাঁদবে না। স্টপ ক্রায়িং। তুমি বাচ্চা না, বাচ্চার বাপ। তোমার ছয় বছরের একটা ছেলে আছে। সে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায়। সন্ধ্যেবেলায় ঘাড় দুলিয়ে পড়ে, আমি হবো সকাল বেলার পাখি, সবার আগে উঠবো জেগে...
আচ্ছা, কবি সবার আগে ঘুম থেকে জেগে ওঠার কথা কেনো বলেছেন? জেগে উঠে করবেটাই বা কি। মানুষের জীবনের স্বপ্নটাই বা কত বড়? এক জীবনে এতো কিছুই কেনো অর্জন করতে হয় মানুষের?
আজকাল আমার কোনো কাজ নাই। শুয়ে থাকতে থাকতে আমি কতকিছু নিয়ে ভাবি। সবচেয়ে বেশি ভাবি মা'য়ের কথা। এইবার দেশে গেলে পুরো সময়টাই কাটাবো মায়ের সাথে। সকাল বিকাল রাত বিভিন্ন কিছু খাওয়ার আবদার করে মা'কে ব্যস্ত করে রাখবো। একটু পর পর ডাকবো, মা', ও মা, কই গেলা। আমার তোয়ালে পাই না। আবার গোসলের সাবান কে নিলো। আরে টুথব্রাশ তো এখানেই রেখে ছিলাম। হাওয়া হয়ে গেলো নাকি? যাতে মা পাড়া বেড়াতে না পারে। কাজিবাড়ির বড় চাচী এলে যাতে মা' মুখ ভঙি করে বলে, আরে মমিন পাগলাটা বাড়ি আইছে। ও কি আর আমাকে একটু শান্তিতে ঘুরতে দিবে। সারাক্ষণ আঁচল ধরে থাকবে।
মাঝে মাঝে আমি মৃত্যু নিয়েও অনেক কথা ভাবি। আচ্ছা, মৃত্যু কি জিনিস? মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়?
আমার দাদি বলতেন মৃত্যুর পর মানুষ তারাদের দেশে চলে যায়। সে-ও একটা নক্ষত্র হয়ে ঘুরে বেড়ায় নক্ষত্রপুঞ্জে। আমার ছোটো চাচাও (মজনু চাচা) নাকি আকাশের তারা হয়ে গেছেন। যুদ্ধের বছর মজনু চাচাও সবার সাথে বাড়ি ছেড়ে বের হয়েছিলেন। তবে আর ফিরে আসেন নি। দাদি রোজ সন্ধ্যেবেলা ছাদে ওঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছেলের সাথে কথা বলতেন। শেষ বয়সে তিনি পাগল হয়ে যান। মজনু চাচার জন্য কম্বল নিয়ে ছাদে উঠতেন। কম্বল পেঁচিয়ে ছাদে গড়াগড়ি খেতেন। চিৎকার করে কাঁদতেন। আমরা নামিয়ে আনতে গেলেন অনুনয় করে বলতেন, মাঘ মাসের ঠান্ডা। আমার মজনু একটা শার্ট গায়ে ঘুরে বেড়ায়। তোরা ওরে একটা জাম্পার কিনে দে। পোলাডার একটা কম্বলও নাই, ঘুমাইতে কত কষ্ট হয়!
আজ সন্ধ্যেবেলা কয়েকজন ডাক্তার এসে ছিলো। তাদের সবার মুখ শুকনো। আমার দিকে কেউ ভালো করে তাকালো না তয় খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে মনিটরের স্ক্রীনে তাকিয়ে রইলো। হয়তো খুব শীঘ্রই আমার লাইফ সাপোর্ট খুলে দিবে। আমি তখন মজনু চাচার মতো নক্ষত্র মালায় ঘুরে বেড়াবো। মাধ্যাকর্ষণ, আহ্নিক গতি, পৃথিবীর দুটি বস্তুকণার মধ্যে আকর্ষণ কিংবা নিউটনের থার্ড ল'- কোনো কিছুই তখন আর আমাকে স্পর্শ করবে না। শুরু হবে আমার অনন্ত নক্ষত্রবীথির যাত্রা!
আচ্ছা, নক্ষত্রপুঞ্জে কি মাঘ মাসে খুব ঠান্ডা পড়ে? গরম কালে গরম? সেখানেও কি রূপালি চাঁদ ওঠে। ইন্দ্রপুরীর সমস্ত রূপ মেলে ধরে মেঘবালিকার নরম কাঁচুলির ভালোবাসায়? যে ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বেবিলিওনের যুদ্ধা পুরুষ হাজার বছর ধরে পথ হাঁটে, - ছেড়ে দেয় ভূমিজাত বিজয়ের আদিম নেশা। যে ভালোবাসায় বুদ্ধও বুঝি জীবন ভিক্ষে চায় বারবার। নাকি বুড়ি চাঁদ সে-ও জীবনানন্দের ভাষায় বেনো জলে ভেসে যায়! ভালোবাসাও সহমরনের ন্যায় ব্যবচ্ছেদে চিৎ হয়ে ঘুমায় লাশকাটা ঘরে!
বৈশাখের সন্ধ্যায় সেখানেও কি আকাশ কালো করে মেঘ ডাকে? বুকের পাঁজর জুড়ে আঁকড়ে থাকা কষ্টগুলো মিথ্যে অভিমানে ডানা মেলে? প্রেয়সীর এক চিলতে নরম ভালোবাসার আশায় দুয়ার খুলে অপেক্ষায় থাকে কোনো এক দূর গাঁয়ের প্রেমিক পুরুষ? নাকি পিতামহীর আজন্ম সাধ কাঁধে নিয়ে তাকেও বয়ে বেড়াতে জীবনের সদজ্জ লাজ?
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কাজলটা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে। জহির ভাই একরাশ ভাবনা নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে! তাকিয়ে থাকে!
#মোহাম্মদজহির_লন্ডন।
Comments
Post a Comment