“বছর ত্রিশ আগে আমরা ঠিক করলাম, একটা পারিবারিক দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করব৷
দেয়াল পত্রিকার নাম হবে ‘সুনীল সাগর’৷ আমি সেই নাম পাল্টে নাম দিলাম ‘সুনিলিত সাগরিত’৷
সম্পূর্ণ অর্থহীন নাম। আমি প্রধান সম্পাদক৷ জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব হল পত্রিকার অঙ্গসজ্জার দায়িত্বে।
পনেরো দিন পর পর ঢাউস এক কাগজে সবার লেখা ছাপা হতো৷ কেউ বাদ যেত না।
সুনিলিত সাগরিত পত্রিকাটি আমাদের পারিবারিক ধারাবাহিক ইতিহাস।
আমার নিজের লেখালেখির ইতিহাস। আমার দুই ভাইয়ের লেখালেখিরও ইতিহাস।
দুই বোন সুফিয়া ও শিখুও ভালো লিখত৷ তারা কেন জানি এই পারিবারিক পত্রিকার বাইরে নিজেদের প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকল৷
দেয়াল পত্রিকার প্রকাশনা অতি সঙ্গত কারণেই ছিল অনিয়মিত৷
একটা পর্যায়ে প্রকাশনা হয়ে দাঁড়াল পারিবারিক বিশেষ বিশেষ ঘটনা নির্ভর।
পরিবারের একজন সদস্যের বিয়ে হচ্ছে, সেই উপলক্ষে প্রকাশনা৷
কেউ প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে যাচ্ছে বা কারো প্রথম সন্তানের জন্ম হচ্ছে, সেই উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা ৷
সুনিলিত সাগরিতের সর্বশেষ সংখ্যাটি বের হয় আমার বড় মেয়ে নোভা আহমেদের বিয়ে উপলক্ষে৷
পরিবারের বাহিরের কারো লেখাই এখানে প্রকাশের নিয়ম নেই।
কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা ছিল ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নোভাকে আশীর্বাদ জানিয়ে যে চারটি লাইন লিখেছিলেন তা পত্রিকায় ঢোকানোর৷ তা সম্ভব হয়নি।
সংসার ছেড়ে বাইরে চলে আসার কারণে পত্রিকাটির ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
আমি নিজে যে লেখাটি লিখেছিলাম সেটিও প্রকাশ হবে কিনা তা নিয়েই শঙ্কিত ছিলাম।
আমি আমার বড় মেয়ের বিয়েতে বিশেষ কোনো উপহার দিতে চেয়েছিলাম৷
শাড়ি, পয়সা, ফ্রিজ, টিভির বাইরে কিছু৷ কী দেয়া যায় কী দেয়া যায়? নোভার অতি প্রিয় লেখকের নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
নোভার বিয়ের আসরে তার প্রিয় লেখককে উপস্থিত করলে কেমন হয়? এই উপহারটি হয়তো তার পছন্দ হবে
। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর শ্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়কে নিমন্ত্রণ জানালাম। তাঁদের বললাম, “মেয়ের বিয়েতে gift হিসেবে তাঁদের প্রয়োজন৷”
আমাকে অবাক করে দিয়ে দুজনেই চলে এলেন৷ এয়ারপোর্টে থেকে সরাসরি বিয়ের আসর বিডিআর-এর দরবার হলে উপস্থিত হলেন৷
নোভা তার বরকে নিয়ে স্টেজে বসে আছে৷ বিয়ের এবং উৎসবের উত্তেজনায় সে খানিকটা দিশেহারা।
আমি বললাম, “মা, তোমার বিয়ের গিফট দেখে যাও।” নোভা তার অতি প্রিয় লেখককে বিয়ের আসরে উপস্থিত দেখে চমকে উঠল৷
পাঠক কি ধরতে পেরেছেন মানুষকে চমকে দেয়ার একটা প্রবণতা আমার মধ্যে আছে।
সৃষ্টিশীল সমস্ত কর্মকাণ্ডে ‘চমক’ একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
আমরা কখন চমকাই? সচরাচর যা ঘটে না তা ঘটতে দেখলে চমকাই।
একজন Fiction writer চমকের ব্যাপারটি কিন্তু তাঁর মাথায় রাখেন,
কেউ অবচেতনভাবে এই কাজটি করেন, আবার কেউ সচেতনভাবেই করেন ৷
যেমন জর্জ বার্নাড শ। লেখালেখির সময় সচেতন এবং অবচেতনভাবে অনেক কিছু করতে হয় বলেই এই কর্মটি অতীব জটিল ৷
“Writing is a dog‘s life, but the only life worth living.” —Gustave Flauvert.
“লেখকের জীবন হলো কুকুরের জীবন, কিন্তু এই একমাত্র অর্থবহ জীবন৷”
—হুমায়ূন আহমেদ (বলপয়েন্ট)
Comments
Post a Comment